Friday, April 10, 2020

লকডাউন
কিছুদিন ধরেই শুনছিলাম, চীন এ নতুন ভাইরাস এসেছে, নানা রকম গুজব ছড়াচ্ছে, কেউ বলছে বাঁদুড় থেকে এসেছে, কেউ আবার অন্য কথা বলছে ।  নেট এ, হোয়াটসআপ এ না না রকম ছবি ছড়িয়ে পড়ছে। করোনা নিয়ে নানা জোকস ও শেয়ার হচ্ছে।  তখন ভাবি নি আমাদেরও এক চরম পরিস্থিতির সম্মুখীন হতে হবে। হটাৎ করে সারা দেশে লকডাউন ঘোষণা করা হলো। সব বন্ধ। কেউ বাড়ির বাইরে যেতে পারবে না।  প্রথম প্রথম বেশ উত্তেজনা লাগছিলো, সেই কর্ম জীবন শুরু হওয়ার পর কোনোদিন এমন ভাবে বাড়িতে থাকতে পারিনি।  প্রথম ১৫ দিন বেশ কাটলো। আবার ১৫ দিন ঘোষণা হলো। জীবনের সব দিন বা সব মুহূর্ত ভালো কাটবে তেমন কোনো নিয়ম নেই। যদিও ভালো মন্দ কেমন কাটবে অনেকটা আমাদের মনের ভেতরের ব্যাপার। কিন্তু দার্শনিক কথা সব সময় ভালো লাগে না, বিশেষ করে সময় খারাপ গেলে। ঘরে বসে অফিসের কাজ, যোগাযোগ সব মোবাইল নির্ভর।  জিনিস না থাকলেই তার মর্ম বোঝা যায়, সেটা বুঝলাম যখন একদিন সকালে মোবাইল লকডাউন ঘোষনা করলো। আঙুলের চাপ নিতে না পেরে করলো চোখ বন্ধ। একেই বন্দি জীবন, তার উপর এই দুর্ঘটনা, সব যোগাযোগ ছিন্ন। ভীষণ রাগ হলো, কিন্তু কিছুই  করার নেই। এই পরিস্থিতি তে মানুষ অন্যের উপর দোষ দিয়ে একটু শান্তি পায়। একটা মূল্যবান নির্জীব বস্তুর উপর আর কি রাগ দেখাবো। দিশেহারা অবস্থা। ঠিক তখন দেখি একটা আরশোলা চিত হয়ে শুয়ে হাত পা ছুঁড়ছে, মনে মনে বললাম এমন তো আমার করার কথা, তোমার কি হোলো? একটা লাল পিঁপড়ে পায়ে কুটুস করে কামড়ে বলে নিজের চড়কায় তেল দাও। পিঁপড়ে! আমাদের থেকে কমজোর জীব, সে মানুষ বা অন্য প্রাণী  যাই হোক, আমরা শাস্তি দিতে পারলে ভীষণ আনন্দ পাই।  সেই কারণেই পিঁপড়েটাকে আঙ্গুল টিপে মারতে যাব, একটা বোলতা আমার দিকে একপাক ঘুড়ে শাশিয়ে গেল, খবরদার! মাথা নিচু করে বাঁচতে গিয়ে, টেবিলের কোণায় খেলাম গুতো, সামলে নিয়ে চেয়ারে বসতেই, হাতল ভেঙ্গে পড়লাম মেঝেতে, মাটিতে পরে থাকা পিন সোজা গিয়ে ফুটলো হাটুতে, ব্যাথায় আঃ করতে গিয়ে মুখ হয়ে গেল হা, বন্ধ করতেই কামড় পড়ল জিবে, রাগের চোটে হাত ছুড়তেই, টেবিলে থাকা জল ভর্তি গ্লাস পড়ল মাটিতে। পোছা আনতে গিয়ে পিছলে পড়লাম আবার, কোমড়ে লাগল চোট, উঠে দাঁড়াতেই, পায়ে আটকে পাজামার দড়ি গেল ছিঁড়ে। ভাবছি আর কত, মনের ভেতরে কে যেন ম্যারাথন দৌড়াচ্ছে, অথবা কেউ বসে হাতুরি দিয়ে অনবরত পাথর ভেঙ্গে চলেছে, থামছে না, মনে হচ্ছে মাথাটা বিগব্যাং এর মত ফেটে চারিদিকে গ্রহ নক্ষত্র সব ছড়িয়ে পড়বে। 
এভাবে চলতে পারে না, এর শেষ নেই। এর থেকে বেরোতে হবে, জানি এবার ভেতরে দেখার সময় এসেছে, যখন বাহ্যিক পরিস্থিতি হাতের বাইরে চলে যায়, আর কোনো উপায় থাকে না, বোধহয় এক ধাপ এগোবার সময় তখনই আসে। ধীর পায়ে ব্যালকনিতে গিয়ে দাড়ালাম, বসন্তের মলয় বাতাস ভালবাসা বুলিয়ে দিল গায়ে, মাধবিলতার ফুলের বাহার ছুঁয়ে গেল মন, গন্ধরাজের সুবাস, নীল আকাশ, কোকিলের ডাক, সবাই বলল আজ থাক, এস আমাদের কাছে, শান্ত হয়ে বসো কিছুক্ষণ, বুকে ভরে শ্বাষ নাও । চলাফেরার সীমাবদ্ধতা কাটিয়ে ওঠো, মনের তো সীমা নেই, ছোটাও তাকে, অসীমের মাঝে খুঁজে পাও নিজেকে। দেখলাম আরশোলাটা অনেক চেষ্টার পর, সোজা হয়ে, এগিয়ে চলছে নিজের গন্তব্যের পথে।
শুভাশিষ

No comments:

Post a Comment