Wednesday, December 29, 2021

 

আছি অথচ নেই

এই পরিবারে আমি সবচেয়ে অবহেলিত। আমার থাকার কোনো নির্দিষ্ট জায়গা নেই। বাকিদের সকলের আছে। বাড়ির লোকের উপর নির্ভর করে আমি কখন কোথায় থাকবো । নিয়ে বাকিরা সবাই হাসাহাসি করে, আমি জানি। বিশেষ করে ওই বেটে মোটাটি যার মুখে ভিষণ ধার। আমার সাথে কি যে শত্রুতা বুঝিনা।  আর এখানে কিছু চামচা আছে, আর এক জন আছে কথায় কথায় চিম্টি কাটে।  এদের সকলের থাকার  নির্দিষ্ট জায়গা আছে, আমার নেই। কিন্তু, এমন অবস্থা আমার সবসময় ছিল না।  বয়স বাড়ার সাথে সাথে আমার কদর কমেছে। 

কাজে কর্মে তেমন দক্ষতা আর নেই, গায়ের রঙ ফিকে হয়ে গেছে, যদিও  ওটাই আমার গর্ব ছিল এক সময়।  বাড়িতে আছি কতদিন হোল মনে নেই। ঠাকুমা, বাবা, মা   ছোট্ট বোনকে নিয়ে আমাদের সংসার। যখন এলাম তখন কত যত্ন, আমার সুন্দর একটা জায়গা ছিল থাকার। যবে থেকে বাড়ির সব ঘর গুলো নতুন করে সাজানো হলো তখনই আমার ঘর ভাঙলো। অথচ আমি কি করিনি বাড়ির  সকলের জন্যে। এখনো করে যাচ্ছি। মায়ের, বৌদির, বোনের বিভিন্ন কাজেতেই আমার ডাক পরে, তার পরেও এই অবহেলা সহ্য করতে হয়, মাঝে মাঝে মনে হয় চলে যাব এই বাড়ি থেকে, শুধু ঠাকুমার জন্যে মন খারাপ হয়। দাদার কথা কি আর বোলবো, কত কাজে ব্যবহার করে আমাকে তার হিসেবে দিতে রাত ভোর হয়ে যাবে। আমি তো কাউকে বলি না, মাঝে মাঝে লুকিয়ে আমাকে বাথরুমে নিয়ে যায়, বলে গোঁফ কেটে দে। মা জানলে আস্ত রাখবেন না। এই তো কিছু দিন আগে আমাকে দিয়ে স্ক্রু টাইট করতে গিয়ে একটা আঙ্গুলে চোট লাগলো। কি আর বলবো, কেন বাবা আমার যা কাজ আমাকে দিয়ে তাই করাও, সব কাজ কি আমি পারি, বয়স হয়েছে না। সকাল হলেই আমাকে ঠাকুমার দরকার হয় দুধের প্যাকেট কেটে জ্বাল দেবার জন্যে তারপর যেমন যেমন কাজ আসে করি। বাকিদের কাজের পর সবাই যে যার ঘরে  চলে যায়, আমার কোন ঘর নেই বিশেষ করে তো ধার মুখোকে তো সবাই সমঝে চলে, কখন কি করে দেবে কেউ জানে না তাই ওর জায়গা কখন বদলায় না। আর আমি থাকি বাড়ির লোকের দয়ায়। মাঝে মাঝে তো এমন হয় যে দুদিন ধরে আমায় খুঁজেই পায় না। তখন ধারমুখো আমার কাজ গুলো করে দেয়, আর ওর কদর বারে। এইতো সেদিন চামচেটার এক ধাক্কায় শোকেসের পেছনে চলে গেলাম। দুদিন সেখানেই ঘুমিয়ে কাটিয়ে দিলাম। আমার মনে হয় ঠাকুমাই আমাকে সবচেয়ে বেশি ভালোবাসেন, আমায় না পেলেই বাড়ি মাথায় করেন সবাইকেই বকাবকি করেন, কিন্তু কে কার কথা শোনে।  কেন যে আমার একটা মাথা গোজবার জায়গা নেই। শুরুতে সবাই খেয়াল রাখতো যখন আমার বয়স কম ছিল, এখন  কাজ করলেও কদর নেই, পুরোনো হয়ে গেছি যে।

তবে আজ যা হলো, আমার হয়তো বাড়ি আর ফিরে আসা হবে না। সকালে মায়ের কাজ করে একটু বিশ্রাম নিচ্ছি পাশে  কতগুলো কাটা সব্জির খোসা রাখা। নমিতা এসে আমায় সমেত খোসাগুলো নিয়ে ময়লার বাক্সে ফেলে দিলো। বাঁধা দিতে গেলাম পারলাম না। মনে মনে প্রার্থনা করলাম  আজ যেন আমার কেউ খোঁজ করে, কারো যেন দরকার হয় আমায় আজ।  দুঃখে ক্লান্তিতে চোখ বন্ধ হয়ে আসে।  মনে পড়ে যায়  বাড়িতে কাটানো দিনগুলোর কথা। কত সময় কেটে গেছে জানি নাহটাৎ এক ঝাকুনিতে জেগে উঠি। আনন্দে আত্মহারা হয়ে যাই। এই তো আমায় খুঁজে পেয়েছে।  ভালো করে চেয়ে দেখি থলে সমেত আমাকে ময়লার গাড়িতে ছুঁড়ে ফেলা হলো। গাড়ি এগিয়ে যাচ্ছে পরের বাড়ির দিকে। 

ঠিক শুনতে পেলাম রান্নাঘর থেকে ঠাকুমা বলছেন "কাঁচিটা কোথায় গেলো রে?"

No comments:

Post a Comment