যদি খুঁজে পাও এমন হৃদ্স্পন্দন,
ঝড় থামিয়ে যা শান্ত করে মন।
আঁকড়ে ধরো সর্ব শক্তি দিয়ে,
ভীড়ের মাঝে যেন না যায় হারিয়ে
এক পলকে এপার থেকে ওপারে,
কে জানে কোনটা বেশি সত্যি,
এপার না ওপর ?
যারা এপারে আছি এখনো
অতৃপ্তি, হিংসা, অহংকারে, অভিমানে,
আত্মগরিমায় ভুলে থাকি সব।
ভাবুক হই; যখন চোখের সামনে
মুহূর্তে কেউ চলে যায়
এপার থেকে ওপারে।
আবার ভুলে গিয়ে ভেসে যাই,
ভাসতে থাকি কোন এক পলকের অপেক্ষায়।
কে জানে কোনটা বেশি সত্যি,
এপার না ওপার ?
আছি অথচ নেই
এই পরিবারে আমি সবচেয়ে অবহেলিত।
আমার থাকার কোনো নির্দিষ্ট জায়গা
নেই। বাকিদের সকলের আছে। বাড়ির লোকের উপর
নির্ভর করে আমি কখন কোথায় থাকবো । এ
নিয়ে বাকিরা সবাই হাসাহাসি করে,
আমি জানি। বিশেষ করে ওই বেটে
মোটাটি যার মুখে ভিষণ ধার।
আমার সাথে কি যে
শত্রুতা বুঝিনা। আর এখানে কিছু চামচা আছে, আর এক জন আছে কথায় কথায় চিম্টি কাটে। এদের সকলের থাকার নির্দিষ্ট জায়গা আছে, আমার
নেই। কিন্তু, এমন অবস্থা আমার
সবসময় ছিল না। বয়স বাড়ার সাথে সাথে আমার কদর কমেছে।
কাজে কর্মে তেমন দক্ষতা আর নেই, গায়ের রঙ ফিকে হয়ে গেছে, যদিও ওটাই আমার গর্ব ছিল এক সময়। এ বাড়িতে আছি কতদিন হোল মনে নেই। ঠাকুমা, বাবা, মা ও ছোট্ট বোনকে নিয়ে আমাদের সংসার। যখন এলাম তখন কত যত্ন, আমার সুন্দর একটা জায়গা ছিল থাকার। যবে থেকে বাড়ির সব ঘর গুলো নতুন করে সাজানো হলো তখনই আমার ঘর ভাঙলো। অথচ আমি কি করিনি এ বাড়ির সকলের জন্যে। এখনো করে যাচ্ছি। মায়ের, বৌদির, বোনের বিভিন্ন কাজেতেই আমার ডাক পরে, তার পরেও এই অবহেলা সহ্য করতে হয়, মাঝে মাঝে মনে হয় চলে যাব এই বাড়ি থেকে, শুধু ঠাকুমার জন্যে মন খারাপ হয়। দাদার কথা কি আর বোলবো, কত কাজে ব্যবহার করে আমাকে তার হিসেবে দিতে রাত ভোর হয়ে যাবে। আমি তো কাউকে বলি না, মাঝে মাঝে লুকিয়ে আমাকে বাথরুমে নিয়ে যায়, বলে গোঁফ কেটে দে। মা জানলে আস্ত রাখবেন না। এই তো কিছু দিন আগে আমাকে দিয়ে স্ক্রু টাইট করতে গিয়ে একটা আঙ্গুলে চোট লাগলো। কি আর বলবো, কেন বাবা আমার যা কাজ আমাকে দিয়ে তাই করাও, সব কাজ কি আমি পারি, বয়স হয়েছে না। সকাল হলেই আমাকে ঠাকুমার দরকার হয় দুধের প্যাকেট কেটে জ্বাল দেবার জন্যে। তারপর যেমন যেমন কাজ আসে করি। বাকিদের কাজের পর সবাই যে যার ঘরে চলে যায়, আমার কোন ঘর নেই বিশেষ করে তো ধার মুখোকে তো সবাই সমঝে চলে, কখন কি করে দেবে কেউ জানে না তাই ওর জায়গা কখন বদলায় না। আর আমি থাকি বাড়ির লোকের দয়ায়। মাঝে মাঝে তো এমন হয় যে দুদিন ধরে আমায় খুঁজেই পায় না। তখন ধারমুখো আমার কাজ গুলো করে দেয়, আর ওর কদর বারে। এইতো সেদিন চামচেটার এক ধাক্কায় শোকেসের পেছনে চলে গেলাম। দুদিন সেখানেই ঘুমিয়ে কাটিয়ে দিলাম। আমার মনে হয় ঠাকুমাই আমাকে সবচেয়ে বেশি ভালোবাসেন, আমায় না পেলেই বাড়ি মাথায় করেন। সবাইকেই বকাবকি করেন, কিন্তু কে কার কথা শোনে। কেন যে আমার একটা মাথা গোজবার জায়গা নেই। শুরুতে সবাই খেয়াল রাখতো যখন আমার বয়স কম ছিল, এখন কাজ করলেও কদর নেই, পুরোনো হয়ে গেছি যে।
তবে আজ যা হলো,
আমার হয়তো এ বাড়ি
আর ফিরে আসা হবে
না। সকালে মায়ের কাজ করে একটু বিশ্রাম নিচ্ছি পাশে কতগুলো কাটা সব্জির খোসা রাখা।
নমিতা এসে আমায় সমেত
খোসাগুলো নিয়ে ময়লার বাক্সে
ফেলে দিলো। বাঁধা দিতে গেলাম পারলাম
না। মনে মনে প্রার্থনা
করলাম আজ যেন আমার
কেউ খোঁজ করে, কারো
যেন দরকার হয় আমায় আজ।
দুঃখে ক্লান্তিতে চোখ বন্ধ হয়ে
আসে। মনে পড়ে যায় এ বাড়িতে কাটানো
দিনগুলোর কথা। কত সময়
কেটে গেছে জানি না, হটাৎ এক ঝাকুনিতে
জেগে উঠি। আনন্দে আত্মহারা
হয়ে যাই। এই তো
আমায় খুঁজে পেয়েছে। ভালো করে চেয়ে
দেখি থলে সমেত আমাকে
ময়লার গাড়িতে ছুঁড়ে ফেলা হলো। গাড়ি
এগিয়ে যাচ্ছে পরের বাড়ির দিকে।
ঠিক শুনতে পেলাম রান্নাঘর থেকে ঠাকুমা বলছেন
"কাঁচিটা কোথায় গেলো রে?"
পেন
উচ্চ শিক্ষিত রুদ্র রায়। বছর দুই হল একটি আন্তর্জাতিক সংস্থার সর্বোচ্চ পদ থেকে অবসর নিয়েছেন। একসময় বিভিন্ন সংস্থায় দাপিয়ে বেড়িয়েছেন। অনেক লোক কে ঘোল খাইয়েছেন। অনেকের চাকরী খেয়েছেন। দেশে বিদেশে, পার্টিতে, বড় বড় ক্লাবে তাঁর নিত্য আসা যাওয়া চলত। এখনো সাথে অহংকারের একটা ভার বহন করেন, তা ওঁর চোখ মুখ দিয়ে গরম তেলের মতো চুইয়ে পরে সবসময়। সংসারী মানুষ হলেও স্বভাব অনেকটা মাছের মতো। স্ত্রী, ছেলে, বৌমা সবাই সমঝে চলে রুদ্র রায়কে। এমন কি ছয় বছরের নাতি রুমনও বাদ যায় না। ওঁর কাজের টেবিলে একটা ডাইরী, সবচেয়ে প্রিয় একটি দামি পেন, কিছু বই, সিগারের বাক্স,আরো টুকি টাকি জিনিস সবসময় ঠিক ঠিক জায়গায় সাজানো থাকে। সে ঘরে অনধিকার প্রবেশ নিষেধ। একবার ওঁর পেন ব্যবহার করে মাসের ফর্দ লিখতে গিয়ে স্ত্রী বিমলা ভীষণ ধমক খেয়েয়েছিলেন।
রুমনেরও খুব কৌতুহল দাদুর ঘর আর তাঁর সব জিনিসের প্রতি। মাঝে মাঝে দাদুর অবর্তমানে গিয়ে টেবিল থেকে এটা ওটা নিয়ে দেখে। তেমনই একদিন সুযোগ পেয়ে দাদুর প্রিয় পেন দিয়ে নিজের কাগজে আঁকিবুকি কেটে চলে আসে। কিছুক্ষন বাদে রুদ্র রায় ফিরে আসেন।
'কে আমার ঘরে ঢুকেছিলো?', হুঙ্কার শোনা যায়। বিমলা ছুটে আসেন, সাথে কাজের লোক ও বৌমা।
'কে আমার পেনে হাত দিয়েছিলো? টেবিলের উপর পেনটা ঢাকনা খোলা পরে থাকতে দেখেন সকলে। রুমন মায়ের আঁচলে মুখ লুকোয়।
সেদিন একেবারে তুলকালাম কান্ড। সবাই কে জেরার পর জানা গেলো যে রুমনকে ওই ঘরের দিকে যেতে দেখা গিয়েছিল। ছেলে বৌমাকে এমন কি বিমলাকে তার জন্যে অনেক কথা শুনতে হয়েছিল সেদিন। তার পর থেকে দাদুর ঘরে লুকিয়ে যাওয়াও বারণ হয়ে গেল রুমনের।
আজ প্রায় ছ'মাস হলো রুদ্র রায় গত হয়েছেন। সেই ঘরে যাবার আর কারো কোনো বিধি নিষেধ নেই। রুমন এখন আট। একদিন দাদুর ঘরে খেলতে খেলতে খাটের কোণে হটাৎই সেই বহু আকাঙ্খিত পেনটা ধুলোমাখা অবস্থায় পরে থাকতে দেখে।
হাতে তুলে রুমন অবাক হয়ে তাকিয়ে থাকে পেনটার দিকে।
এপ্রিল ফুল
সুভাশিষ
অফিস থেকে ফিরে আমার একটাই কাজ। হাত মুখ ধুয়ে পরিষ্কার হয়ে, পাজামা পরে টিভির সামনে এক কাপ চা নিয়ে বসা, আর খবরের চ্যানেল দেখা, সন্ধ্যে আটটা থেকে রাত এগারোটা পর্যন্ত। তখন কেউ বিরক্ত করুক ভালো লাগে না। সেটা আমার বন্ধুরা জানে, তাই সাধারণত কেউ ওই সময় বাড়িতে আসে না বা ফোন করে না।
সেদিন হটাৎ সুবিমল এসে হাজির। হাতে মিষ্টির ঠোঙা। ও নাকি বিএমডাব্লিউ কিনেছে তার পুজো দিয়ে এলো। আমি তো অবাক, কারণ ওর এলেম অজানা নয়। বললাম গাড়ি দেখা, বললো কাল নেবো। 'কাল আমার সাথে তোকে যেতে হবে', আমি এক কথায় রাজি । অফিস বাদ দিয়ে ওর সাথে গেলাম।
অনেক ঘুরে এক সাইকেলের দোকানে ঢুকে একটা নতুন সাইকেল ডেলিভারি নিলো। কোথায় বিএমডাব্লিউ? আমার মাথায় রক্ত উঠে গেলো, নেহাত ছোট বেলার বন্ধু। বললাম এটা কি হলো?
সুবিমল বললো এপ্রিলফুল। ফেব্রুয়ারি মাসে এপ্রিলফুল? রাগে আমার মাথায় আগুন জ্বলে উঠলো।
ও বললো তোর তো প্রতিদিনই এপ্রিল ফুল ডে।
কেন?
ওই খবরের চ্যানেল গুলো তো তোকে প্রতিদিন এপ্রিলফুল করছে।